@সূরাহ আল-ফাতিহাহ, 5 নং আয়াহ। বিজ্ঞানের বিজ্ঞান আল-কুরআন এবং কুরানী বিশ্লেষণ। অনুবাদে : হোসেন কুরানী।
1 নং সূরাহ আল-ফাতিহাহ।
(মাক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা 7)
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
অর্থাৎ আল্লাহর নামে (শুরু), (যিনি) সীমাহীন/ অসীম দয়ালু এবং সীমাহীন/ অসীম করুণাময়।
5 নং আয়াহ: (হে আল্লাহ, যেহেতু আমরা শুধুমাত্র আপনার ইবাদাত করি ও আপনার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। সে হেতু হে আল্লাহ, ) আমাদেরকে¹ দেখান² সহজ-সরল³ ও সঠিক পথ⁴।
1:5 আয়াহ, কুরানী বিশ্লেষণ 1)
সুধী পাঠক, এখানেও গত 1:4 আয়াহ'র মতোই نَا (না'আ) ব্যবহার করে প্রার্থনাটা বহুবচনে করা হচ্ছে। এখন আর নিশ্চয়ই এখানে "আমাদেরকে"র ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই!! তাই না?? কারণ, গত আয়াহ'তে আমরা "আমরা"র একাধিক ব্যাখ্যা দিয়েছি, তাই না??
1:5 আয়াহ, কুরানী বিশ্লেষণ 2)
প্রশ্ন হবে- "পথ দেখান" বলে প্রার্থনা করা হচ্ছে কেন?? পথ আমরা নিজেরা দেখতে পাব না?? আমরা কি অন্ধ, না কি?? উত্তর সহজ- ভাই, এখানে "পথ" বলতে "রাস্তা-ঘাট" এর কথা বলা হয় নি। এখানে "পথ" বলতে ইহজীবনে থেকে ইহকালীন সফলতার এবং তার উপর নির্ভর করে পরকালীন সফলতার পথের কথা বলা হচ্ছে। আর হ্যাঁ, এই পথ শুধুমাত্র আল্লাহ'ই দেখাতে পারেন, কোনও মানুষের পক্ষে তা সম্ভব নয়, দেখুন- إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ অনুবাদ হবে এমন-"নিশ্চয়ই আপনি পথ দেখাতে পারবেন না, আপনি যাকে ভালোবাসেন। কিন্তু আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ দেখান"(28:56)।
প্রশ্ন হবে- আল্লাহ'র থেকে "পথ" প্রার্থনা করলাম, কিন্তু আল্লাহ কি "পথ" দেখিয়েছেন?? উত্তর সহজ- অবশ্যই, তার থেকে আপনি "পথ" চাইবেন, আর তিনি "পথ" দেখাবেন না, তা কি কখনও হয়/ হতে পারে?? তিনি কি বলেছেন, তা আপনাকে দেখাই, দেখুন- ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ অনুবাদ হবে এমন-"তোমরা আমাকে ডাকো, আমি অবশ্যই তোমাদের ডাকে সাড়া দেব"(40:60)। প্রশ্ন হবে- আল্লাহ আমাদের প্রার্থনার জবাব কোথায় দিয়েছেন?? উত্তর সহজ- আচ্ছা পাঠক, সত্যিই কি দেখতে চান?? দেখবেন তো?? কই গো পাঠক, দেখবেন তো?? আচ্ছা চলুন, আপনাকে দেখিয়েই দিই, দেখুন- ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ অনুবাদ হবে এমন-"এটা সেই কিতাব [যা তোমরা প্রার্থনা করেছিলে], যাতে কোনও সন্দেহ নেই, এবং তা মুত্তাকীদের জন্য পথ প্রদর্শক"(2:2)।
এখন হয়ত কেউ-কেউ বলতে পারেন- ও আচ্ছা, তাহলে পবিত্র কুরআন শুধুমাত্র মুমিন-মুত্তাকীদের জন্য, মানব জাতির নয়?? উত্তর সহজ- আপনি 1:5 আয়াত এ আল্লাহ র থেকে পথ চেয়েছেন, তিনি আপনাকে উত্তর দিয়েছেন 2:2 আয়াত এ। আর রইল কথা, পবিত্র কুরআন মানব জাতির জন্য কি না!! এ বিষয়ে আল্লাহ পবিত্র কুরআন এ সরা-সরি বলেছেন- شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ অনু বাদ হবে এমন-"রামাদ্বান মাস হল সেই মাস, যে মাসে মানব জাতির জন্য পথপ্রদর্শক কুরআন নাযিল করা হয়েছে"(2: 185)।
1:5 আয়াহ, কুরানী বিশ্লেষণ 3)
প্রশ্ন হবে- আল্লাহ'র "সহজ-সরল" পথ চাইলাম কিন্তু আল্লাহ যে পথটা দেখালেন অর্থাৎ পবিত্র কুরআন ও হাদীস তথা ইসলাম মেনে চলা এত কঠিন কেন?? উত্তর সহজ- মোটেও কঠিন নয়, কিন্তু বেশিরভাগ (99.99% এর বেশি) তথাকথিত "আলেম বা আলিম" নামের "শাইত্বান" গুলো আল্লাহর প্রেরিত দীন ইসলাম এবং রাসুল (সা)- এর রেখে যাওয়া দীন ইসলাম'কে গোপন করে নিজেদের তৈরি করা "নকল" দীন ইসলাম সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ জন্য পবিত্র কুরআন ও হাদীস মেনে চলা খুব কঠিন মনে হয়। কিন্তু যদি আপনি পবিত্র কুরআন এবং তৎসংলগ্ন সাহীহ ও হাসান হাদীস সরা সরি মেনে চলেন, তাহলে দেখবেন- ইসলাম পালন শুধুমাত্র সহজ-সরলই নয়, বরং পুরো-পুরি অর্থাৎ 100% Practical দীন বা জীবন ব্যবস্থা। যা, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, যা আল্লাহ নিজে ঘোষণা করেছেন 30:30 আয়াত এ।
পাঠক, কিছু উদাহরণ দেখতে চাইবেন?? ১) গান হারাম। কিন্তু সুধী পাঠক, খুব দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পবিত্র কুরআন এবং সাহীহ ও হাসান হাদীস দ্বারা গান হারাম তো দূরের কথা, গানকে মাকরুহ বা অপছন্দনীয় প্রমাণ করাও সম্ভব নয়। বরং "গান হালাল" প্রমাণ করা খুবই সহজ। শুধুমাত্র বুখারীতেই প্রায় 4-5 টা হাদীস রয়েছে গান হালাল এর স্বপক্ষে। তার মধ্যে একটা হাদীস আপনাদের দেখাতে চাই, ঠিক আছে?? দেখুন তবে- আয়িশাহ [রা] হতে বর্ণিত যে, তিনি কোনও এক আনসারীর জন্য এক মহিলাকে বিয়ের কনে হিসাবে সাজালে নাবী [সা] বললেন- হে আয়িশাহ, এতে [বিয়েতে] আনন্দ-ফূর্তির ব্যবস্থা করো নি?? আনসারগণ আনন্দ-ফূর্তি পছন্দ করে"(বুখারী, কিতাবুন নিকাহ, হাদীস 5162)।
প্রশ্ন হবে- এখানে তো আনন্দ-ফূর্তির ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কই গান হালাল এর পক্ষে কোনও দালায়িল পেলাম না!! আর আনন্দ-ফূর্তি বলতে কি গান?? উত্তর খুব সহজ রে ভাই, এই হাদীসটি দেখুন- ইবনু আব্বাস [রা] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- আয়িশাহ [রা] তার এক আত্মীয়ের এক আনসার মেয়ের সাথে বিবাহ দেন। রাসূলু ল্লাহ [সা] এসে বলেন- তোমরা কি মেয়েটিকে [স্বামীর বাড়ি] পাঠিয়ে দিয়েছ?? তারা বলেন- হ্যাঁ। তিনি বলেন- তোমরা কি তার সাথে এমন কাউকে পাঠিয়েছ, যে গান গাইতে পারে?? আয়িশাহ [রা] বলেন- না। রাসূলুল্লাহ [সা] বলেন- আনসার সম্প্রদায় গানের ভক্ত। অতএব তোমরা যদি তার সাথে কাউকে পাঠাতে, যে গিয়ে এরূপ বলত- আমরা এসেছি তোমাদের কাছে, আমরা এসেছি তোমাদের কাছে, আল্লাহ আমাদের দীর্ঘজীবী করুন এবং দীর্ঘজীবী করুন তোমা দের"(ইবনু মাজাহ, কিতাবুন নিকাহ, হাদীস 1900)। এই হাদীস'টিকে অনেকেই الأَجلح আল আজালাহ'র কারণে দ্বায়ীফ বলেছেন। কিন্তু ইবনু হাজার আল আসকালানী বলেছেন-"তিনি সত্যবাদী, কিন্তু তিনি শীয়া মতাবলম্বী"(তাহ যীবুল কামাল, রাবী নং 282, 2/275 নং পৃষ্ঠা)। এ জন্য Scholar'দের কেউ কেউ শুধুমাত্র শীয়া মতাবলম্বী হওয়ার কারণে হাদীস'টিকে দ্বায়ীফ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেন। ফলত এই হাদীস'টিকে গ্ৰহণ যোগ্য/ হাসান পর্যায়ের হাদীস মনে করেছেন।
যাইহোক সুধী পাঠক, আপনি কি বুখারীর 5162 হাদীস এর ব্যাখ্যা পেয়েছেন?? পাঠক, আরও 2-1 টা হাদীস দেখ বেন?? দেখুন, হ্যাঁ?? দেখুন-"আয়িশাহ [রা] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- আবূ বাকার [রা] আমার নিকট আসেন। তখন আমার নিকট 2 টি আনসার বালিকা উপস্থিত ছিল। তারা বু'য়াস যুদ্ধে আনসারদের মুখে উচ্চারিত কবিতা গুলো গানের সুরে আবৃত্তি করছিল। আয়িশাহ [রা] বলেন- তারা পেশাদার গায়িকা ছিল না। আবূ বাকার [রা] বললেন- শাই ত্বানের বাঁশি/ দাফ [বাদ্যযন্ত্র] নাবী [সা] ঘরে?? এ ঘটনা টি ছিল ঈদুল ফিতরের দিনের। নাবী [সা] বলেন- হে আবূ বাকার, প্রত্যেক জাতিরই ঈদ [আনন্দ উৎসব] রয়েছে। আর এটাই হচ্ছে- আমাদের ঈদ। (ইবনু মাজাহ, কিতাবুন নিকাহ, হাদীস 1898)।
এখন হয়ত কেউ কেউ বলতে পারেন- আপনি যে বললেন বুখারীর হাদীস নিয়ে আসবেন, এ তো ইবনু মাজাহ'র হাদীস নিয়ে এলেন!! উত্তর সহজ- যেন আপনি বুখারীর হাদীস'টা ভালো ভাবে বুঝতে পারেন, এ জন্য ইবনু মাজাহ'র হাদীস'টা আপনাকে দেখালাম। আচ্ছা, ঠিক আছে। নিন, এবার দেখে নিন- আয়িশাহ [রা] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- নাবী [সা] আমার নিকট এলেন, তখন আমার নিকট 2 টি মেয়ে বু'য়াস যুদ্ধ সংক্রান্ত গান গাইছিল। তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন এবং মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে রাখলেন। এ সময় আবূ বাকার [রা] এসে আমাকে ধমক দিয়ে বললেন- শাইত্বানের বাদ্যযন্ত্র বাঁশি/ দাফ বাজানো হচ্ছে নাবী [সা]- এর কাছে!! তখন আল্লাহর রাসূল [সা] তার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন- তাদের ছেড়ে দাও। অতঃপর তিনি যখন অন্য দিকে ফির লেন তখন আমি তাদের ইঙ্গিত করলাম, আর তারা বেরিয়ে গেল"(বুখারী, কিতাবুল ঈদায়ীন, হাদীস 949)।
এবার বলুন!! পেয়েছেন তো বুখারীর হাদীস?? আরও একটা দেখবেন?? দেখুন তাহলে-"আনাস [রা] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- নাবী [স্বা] এক সাফরে ছিলেন। তার আনজাশা নামে এক গোলাম ছিল। সে হুদী গান গেয়ে উট গুলো হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তিনি তাকে বললেন- হে আনজাশা, তুমি ধীরে উট হাঁকাও, যেহেতু তুমি কাঁচপাত্র তুল্যদের (আরোহী) উট হাঁকিয়ে যাচ্ছ। আবূ কিলাবাহ বলেন- কাঁচ পাত্র সদৃশ শব্দ দ্বারা নাবী [স্বা] স্ত্রীলোকদেরকে বুঝিয়েছেন। কিতাবুন আদাব, হাদীস 6209 ও 6210)। আমাদের মনে হয় না যে, এ বিষয়ে আরও কিছু বলার প্রয়োজন আছে!! তাই না?? আমরা আপনাকে আরও একটা খুব বিখ্যাত হাদীস দেখাতে চাইব। দেখবেন?? দেখুন-"আনাস ইবনু মালিক [রা] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- নাবী [স্বা] মাদীনাহ র গলিপথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কয়েকটি বালিকা দফ বাজিয়ে গান গেয়ে বলছিল- ‘‘আমরা বনু নাজ্জারের বালিকার দল। কত খোশ নাসীব! মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ [স্বা] আমাদের মহৎ প্রতিবেশী’’। তখন নাবী [স্বা] বলেন- আল্লাহ অবগত আছেন যে, আমি তো তোমাদের ভালোবাসি"(ইবনু মাজাহ, কিতাবুন নিকাহ, হাদীস 1899)।
সুধী পাঠক, আরও একটা হাদীস দেখাতে চাই, যা দেখে আপনি বুঝতে পারবেন যে, নাবী [স্বা]- পরবর্তীতেও মাদীনাহ তে গান-বাজনা চলত। তখনও তা হারাম ঘোষণা করা হয় নি। তাহলে দেখেই একবার দেখেই নিন-"আবূল হুসাইন খারিদ আল-মাদানী [র] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- আমরা এক আশূরার দিন মদিনায় ছিলাম। বালিকারা দাফ বাজাচ্ছিল এবং গান গাচ্ছিল। এরপর আমরা রুবাই বিনতে মুআবিয [রা]- এর নিকট উপস্থিত হলাম এবং ঘটনাটি তাকে জানালাম। তিনি বলেন- আমার বিবাহ বেলা রাসূ লুল্লাহ [স্বা] আমার নিকট আসেন। তখন আমার নিকট 2 টি বালিকা গান গাচ্ছিল এবং বাদার যুদ্ধে নিহত আমার পিতৃ পুরুষদের কীর্তিগাঁথা গাইছিল। তারা এও বলছিল- “আমা দের মধ্যে এমন একজন নাবী [স্বা] আছেন, যিনি আগামী কালের খবরও জানেন”। তখন রাসূলুল্লাহ [স্বা] বলেন- তোমরা একথা বলো না। আগামীকালের খবর আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ জানে না"(ইবনু মাজাহ, কিতাবুন নিকাহ, হাদীস 1897)।
এবার 2-4 টি কথা বলতে চাইছি। বলি?? ক) গান সম্পূর্ণ হালাল। খ) গানে বাঁশি (বাঁশি জাতীয় সমস্ত কিছু, যা হাওয়া বাতাস দ্বারা শব্দ সৃষ্টি করে। যেমন- Harmonium, যা বাংলা হারমোনিয়াম) হালাল এবং দাফ (দাফ জাতীয় সমস্ত আধু নিক বাদ্যযন্ত্র। তেমন- ঢাক, ঢোল, তবলা, Drum music set ইত্যাদি ইত্যাদি)। গ) গানে শিরক হবে, এমন কথা ব্যব হার করা হারাম। শিরক'কে কোনও ভাবে Promote'ও করা যাবে না (31:13, 4:48, 4:116) বিদআত এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য (10:32)। এবং অশ্লীলতাতার ক্ষেত্রেও তাই (6:151, 7:33)। এখন হয়ত কেউ কেউ বলতে পারেন এখানে বলতে পারেন- তাহলে সেই বিখ্যাত হাদীস'টার কি হবে, যা দ্বারা বাজনা বা বাদ্যযন্ত্র হারাম ঘোষণা করা হয়?? সেই হাদীস'টা বলতে এই হাদীস'টা তো, যেখানে নাবী [স্বা] বলেছেন- "আমার উম্মাতের মধ্যে অবশ্যই এমন কত গুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে"(বুখারী, কিতাবুল আশরাব, হাদীস 5590)??
ক) এখানে "গান হারাম" বলা হয় নি। খ) এখানে বলা হচ্ছে যে, যে যে বাদ্যযন্ত্র হারাম, তা হালাল করে ফেলবে। যা হারাম নয়, এখানে তার কথা বলা হয় নি। আচ্ছা হ্যাঁ, এখন হয়ত কেউ বলতে পারেন, এই হাদীস'টার কথা-"মুজাহিদ [র] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন- আমি ইবনু উমার [রা] -এর সাথে ছিলাম। হঠাৎ তিনি তবলার আওয়াজ শুনতে পান। তিনি তার উভয় কানে তার 2 আঙ্গুল ঢুকিয়ে সরে পড়েন। তিনি তিনবার এরূপ করলেন। অতঃপর তিনি বলেন- রাসূ লুল্লাহ [স্বা] এরূপ করেছেন"(ইবনু মাজাহ, কিতাবুন নিকাহ, হাদীস 1901)। সুধী পাঠক, আপনাকে এই শুধু হাদীসের Commentary আপনাকে দেখাতে চাই-"হাদীস'টি ইমাম ইবনু মাজাহ একক ভাবে বর্ণনা করেছেন। রাওদুন নাদীর 568 নং। তাহকীক আলবানী (র) : তবলার কথা মুনকার। তবে রাখালের যামারাহ বাশীর শব্দে সাহীহ। উক্ত হাদিসের রাবী লায়াস সম্পর্কে ইমাম বুখারী বলেন- তিনি সত্যবাদী তবে হাদিস বর্ণনায় সন্দেহ করেন। আহমাদ বিন হাম্বাল (র) বলেন- মুদতারাবুল হাদীস। ইয়াহইয়া বিন মাঈন, আবু যুরআহ এবং আবু হাতিম আর-রাযী (র) বলেন- তিনি দুর্বল"(তাহযীবুল কামাল- রাবী নং 5017, 24/279 নং পৃষ্ঠা)।
এবার সাহীহ হাদীসটা দেখুন-"নাফি [র] সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন- একদা ইবনু উমার [রা] বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনতে পেয়ে উভয় কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে রাস্তা থেকে সরে গিয়ে আমাকে বললেন- হে নাফি, তুমি কি কিছু শুনতে পাচ্ছো?? বর্ণনা কারী বলেন যে, আমি বললাম- না। বর্ণনাকারী বলেন- অতঃপর তিনি কান থেকে হাত তুলে বললেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ [স্বা]- এর সঙ্গে ছিলাম। তখন তিনি এ ধরণের শব্দ শুনে এরূপ করেছিলেন"(আবুদাউদ, কিতাবুল আদাব, হাদীস 4924) কিন্তু এখানেও মুহাম্মাদ (সা) "গান হারাম" বলেন নি। এমনকি বাদ্যযন্ত্রকেও হারাম বলেন নি। এখানে কেউ কেউ বলতে পারেন- ঘৃণা করেন বলেই তো নাবী (সা) নিজের 2 কানে আঙুল দিয়ে ছিলেন!!
কিন্তু পাঠক, বাদ্যযন্ত্রকে ঘৃণা ছাড়াও, বাদ্যযন্ত্র হালাল হওয়া সত্ত্বেও কানে আঙ্গুল দেওয়ার একাধিক কারণ থাকতে পারে। যেমন ধরুন, স্বালাতের জন্য আযান দেওয়া নিশ্চিতই ভালো কাজ, তাই না?? আযান দেওয়া ভালো কাজ হওয়া সত্ত্বেও কেউ যদি আপনার কানের গোড়ায় এসে গায়ের জোরে চেঁচিয়ে আযান দেয়, তা থেকে বাঁচাতে কি আপনি কানে আঙ্গুল দেবেন না?? অবশ্যই দেবেন। তাই না?? এখন তাহলে কি "আযান দেওয়া হারাম" বলবেন?? একটু ভাবুন তো!! তখন হয়ত বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজটা নাবী (সা)- এর কানে লাগছিল। তাই তিনি কানে আঙুল দিয়ে ছিলেন!! তাই না??
এখন হয়ত কেউ এই হাদীসটার কথা বলতে পারেন, দেখুন হাদীসটি-"যে ব্যক্তি গান শুনার উদ্দেশ্যে গায়িকাদের মাজলিসে বসে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কানে [উত্তপ্ত গলিত] শিশা ঢেলে দিবেন"(ইবনে আসাকির, আনাস [রা] হতে মারফু সূত্রে বর্ণিত)। সুধী পাঠক, এবার একবার দেখে নিন- এই হাদীস প্রসঙ্গে আলবানী (র) কি বলেছেন। তিনি বলেছেন- এটি موضوع বা জাল (যাইফুল জামি, হাদীস 5410)। এছাড়াও আরও কিছু দ্বাঈফ (দুর্বল) এবং মাওদুউ (জাল বা মানুষের তৈরি) হাদীস রয়েছে, যা দ্বারা "গানকে হারাম" প্রমাণের অপচেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাদের জন্য খুবই দুঃখজনক সত্য যে- "গান হালাল"।
সুধী পাঠক, ঐ "আলিম নামের শাইত্বান" গুলো শুধুমাত্র "গান হারাম" করেই ক্ষান্ত হন নি, তারা শত শত "হালাল" বিষয়কে হারাম ঘোষণা করেছেন। যদিও আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন- وَقَدْ فَصَّلَ لَكُمْ مَا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ অনুবাদ হবে এমন-"নিশ্চয়ই তিনি বিস্তারিত ভাবে বলেছেন, যা তোমাদের উপর তিনি হারাম ঘোষণা করেছেন"(6:119)। কিন্তু "গান "হারাম- এটা পবিত্র কুরআন দ্বারা অপ্রমাণিত। এখানে সব চেয়ে বেশি হাঁসির কথা হল- পবিত্র কুরআনে "গান" শব্দ বা আরবি أغنية (উগনিয়াহ) কিংবা "সঙ্গীত" শব্দ বা موسيقى (মুউসিকা) শব্দ তথা কালিমাহ'র উল্লেখই নেই। কিন্তু তার পরও এই "আলিম নামের শাইত্বান" গুলো পবিত্র কুরআনে "গান হারাম" মর্মে 2 টি আয়াত দেখতে পেয়ে যান। এখন আমরা আমাদের পাঠকদের সুবিধার্থে আয়াত 2 টি উদ্ধৃতি করছি-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ●
অনুবাদ হবে এমন-"মানুষের মধ্যে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা আল্লাহ'র পথ [বা কুরআন] থেকে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য “গাঁজাখুরি হাদীস” নিয়ে আসে/ তৈরি করে"(31:6)। আচ্ছা পাঠক, বলুন তো- এখানে "গান হারাম" মর্মে কিছু পেলেন কি?? পান নি, তাই না?? ঠিক আছে, এর পরের আয়াহ'টা দেখুন- وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتِكَ অনুবাদ হবে এমন-"[আল্লাহ শাইত্বানকে অনুমোদন দিয়ে বললেন-] তুমি তাদের [মানুষ ও জিন] দের মধ্যে হতে যাকে ইচ্ছা তোমার কন্ঠস্বর দিয়ে ডাক"(17:64)।
পাঠক, দেখুন তো- এখানে "গান হারাম" মর্মে কিছু পেলেন কি?? পান নি, তাই না?? আচ্ছা পাঠক, তাহলে এই শাইত্বান আলিম বা আলেম গুলো এখান থেকে "গান হারাম" এর দালায়িল পায় কিভাবে?? যাইহোক, ঐ "শাইত্বান আলিম আলেম" গুলো আরও হারাম ঘোষণা করে রেখেছেন- ২) বিবাহ পূর্ব প্রেম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আল্লাহ বা রাসূল (স্ব) "বিবাহ পূর্ব প্রেম" হারাম ঘোষণা করেন নি!! এ জন্য "বিবাহ পূর্ব প্রেম"কে হারাম প্রমাণ করার জন্য শাইত্বান আলিম গুলো "গান হারামের" মতোই উল্টা-পাল্টা দালায়িল এর আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তারা "বিবাহ পূর্ব প্রেম" হারামের আয়াহ বা হাদীস (সাহীহ ও হাসান) আর জোগাড় করতে সক্ষম হন না!!
সুধী পাঠক, এবার আমরা খুব অল্প পরিসরে তাদের দালায়িল গুলো বিশ্লেষণ করে নেব। ঠিক আছে?? এবার দেখুন- وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا অনুবাদ হবে এমন-"এবং তোমরা যিনা'আ বা ব্যভিচারের কাছেও যেও না"(17:32)। এখন আমরা আমাদের পাঠকদের কাছে জিজ্ঞাসা করতে চাইছি যে, বলুন তো- এটা বিবাহ পূর্ব প্রেম হারামের দালায়িল, না কি যিনা'আ হারামের?? একটা সাধারণ মানুষও বুঝে নিতে পারবেন যে, এটা বিবাহ পূর্ব প্রেম হারামের দালায়িল নয়, বরং তা যিনা'আ হারামের দালায়িল। তাই না?? পাঠক, এর
পরের দালায়িল-
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ●
অনুবাদ হবে এমন-"মুউমীন পুরুষদের বলে দিন যে, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত [নোংরা ইচ্ছা গুলো দমিয়ে] রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গ সমূহের হিফাজ্বাত করে। এটা তাদের জন্য পবিত্র [জীবন-যাপনের] পদ্ধতি"(24:30)। এছাড়াও 24:31 আয়াহ'তে মুউমীনা নারীদেরও একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাইহোক পাঠক, দেখুন তো- এখানে "বিবাহ পূর্ব প্রেম হারাম" বিষয়ক কিছু পাচ্ছেন?? পান নি, তাই না?? তা হলে ঐ শাইত্বান আলিম গুলো এখানে বিবাহ পূর্ব প্রেম হারাম দেখতে পায় কিভাবে??
যাইহোক, যখন তারা পবিত্র কুরআন থেকে দালায়িল দিতে অক্ষম হন, তখন হাদীসে যাওয়ার আগে একটা যুক্তি দেখিয়ে যান। আর তা হল- তাহলে আল্লাহ (4:3) বিবাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন কেন?? সুধী পাঠক, উত্তরটা দিয়ে আমরাও হাদীসে প্রবেশ করব- ইনশায়াআল্লাহ। এবং উত্তর খুবই সহজ- বিবাহতে যা সম্ভব, প্রেমে তার 10% সম্ভব মাত্র। সুতরাং বাকি 90% এর জন্য বিবাহ প্রয়োজন। তাই আল্লাহ বলেছেন- فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ অনুবাদ হবে এমন-"সুতরাং তাদেরকে বিবাহ করো, নারীদের মধ্যে যাদের কে তোমরা পছন্দ করো তথা ভালোবাসো"(4:3)। মাথায় ঢুকল বোকার বাপ??
এখানে কেউ কেউ বলতে পারেন- আপনি "হানীর সঙ্গে বিবাহ পূর্ব প্রেম" করেছেন, তাই আপনি বিবাহ পূর্ব হালাল প্রমাণের জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছেন!! উত্তর সহজ- তা হালাল বলেই "হোসেন কুরানী হানীর সঙ্গে বিবাহ পূর্ব প্রেম" করে ছেন। মনে রাখবেন- হোসেন কুরানী তার জীবনে জ্ঞানত কখনও মিথ্যা বলেন নি এবং হারামে লিপ্ত হন নি। সুতরাং দ্বিতীয়বার কখনও এই ধরণের অপবাদ দেবেন না। হোসেন কুরানীর ওপর অপবাদ দেওয়ার জন্য যে যোগ্যতার দরকার হবে, সেটাও আপনার মধ্যে নেই!!
এবার হাদীশ দেখুন-"কোনও নারীর দিকে তাকানো চোখের যিনা'আ, তার সঙ্গে কথা বলা মুখের যিনা'আ, তার কথা শোনা কানের যিনা'আ, তার সঙ্গে হাঁটা পায়ের যিনা'আ, তাকে স্পর্শ করা হাতের যিনা'আ"। পাঠক, এই কথাটা আমরা হাদীশ হিসাবে শুনেছি, অনেকে মানেও এই কথা গুলোকে হাদীশ হিসাবে। তাই না?? কিন্তু খুব/ অনেক দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এমন কোনও হাদীশ মুহাদ্দীশরা জীবনে শোনেন নি। প্রশ্ন হবে- তাহলে এমন কথা হাদীশ হিসাবে প্রচার হল কিভাবে?? উত্তর সহজ- ঐ শাইত্বান Type এর আলিম গুলো প্রচার করেছেন, যারা প্রকৃত খৃষ্টান দের "দাদাল"। এটা এ জন্য যে, উক্ত হাদীশ হিসাবে প্রচারিত কথাটি যিশু (আ)- এর, Bible এর। চাইলে একবার Bible খুলে (G O MAT, 5:27-28) দেখে নিন।
এবার সঠিক ও সম্পূর্ণ হাদীশটা দেখুন-"আবূ হুরাইরাহ [রা] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, নাবী [স্বা] বলেছেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা বানী আদামের জন্য যিনা'আর একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের যিনা'আ হলো দেখা, জিহবার যিনা'আ হলো কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খাহেশ সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য বা মিথ্যা প্রমাণ করে"(বুখারী, কিতাবুল আসতাজা আন, হাদীশ 6243)। পাঠক, দেখুন তো- এখানে বিবাহ পূর্ব প্রেম হারাম মর্মে কিছু পেলেন কি?? পান নি, তাই না??
এবার কিছু বলি?? ক) হাদীশটি তাকদীর সম্পর্কিত। খ) তারপর বলা হচ্ছে- মানুষ যিনা'আয় অবশ্যই জড়িত হবে। কোনও নারীকে দেখা চোখের যিনা'আ, তার সঙ্গে কথা বলা জিহবার যিনা'আ। কিন্তু যৌনাঙ্গ উপরিউক্ত ধরণের যিনা'আ গুলোকে সত্য ও মিথ্যা প্রমাণ করে। অর্থাৎ যদি কোনও নারীর যৌনাঙ্গের সঙ্গে আপনার যৌনাঙ্গ মিলিত হয়, তবেই উপরিউক্ত ধরণের যিনা'আ গুলো যিনা'আয় গণ্য হবে, নয়ত নয়। কিন্তু "বিবাহ পূর্ব প্রেম হারাম" কোথায় পেলেন ভাই??
পরের হাদীশ-"উকবা ইবনু আমির [রা] হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ [স্বা] বলেছেন- সাবধান, মহিলাদের সাথে তোমরা কেউ অবাধে দেখা-সাক্ষাৎ করবে না"(তির মিযী, কিরবুর রাদ্বিউ হাদীশ 1171)। এ ছাড়াও আরও হাদীশ রয়েছে-"একজন স্ত্রীলোকের সাথে একজন পুরুষ একাকী থাকলে তাদের মধ্যে শাইত্বান তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে যোগ দেয়"।
আররেহহ ভাই, ঠিক আছে, নির্জনে দেখা করব না। কিন্তু এবার "বিবাহ পূর্ব প্রেম হারাম" বলা হয়েছে কোথায়, সেটা বলুন?? পাঠক, দেখুন তো- এখানে বিবাহ পূর্ব প্রেম হারাম মর্মে কিছু পেলেন কি?? পান নি, তাই না?? জীবনে কখনও পাবেনও না। ঠিক আছে, পরের হাদীশ-"নিশ্চয়ই তোমাদের কারও মাথায় লোহার পেরেক ঠুকে দেয়া ঐ নারীকে স্পর্শ করা থেকে অনেক ভালো, যে নারী তার জন্য হালাল নয়"(তাবারানী। আলবানী, আস সিলসিলাতুস সাহীহ, হাদীশ 226)।
আররেহহ ভাই, ঠিক আছে, স্পর্শ করব না। কিন্তু এবার "বিবাহ পূর্ব প্রেম হারাম" বলা হয়েছে কোথায়, সেটা বলুন?? পাঠক, দেখুন তো- এখানে বিবাহ পূর্ব প্রেম হারাম মর্মে কিছু পেলেন কি?? পান নি, তাই না?? জীবনে কখনও পাবেনও না!! যাইহোক, এখন যদি কারও জ্ঞানের দম থাকে, তাহলে "বিবাহ পূর্ব প্রেম হারাম" প্রমাণ করুন। এবার সব শেষে ঐ শাইত্বান আলিম গুলো 2 টি যুক্তি দেবেন- ক) ঠিক আছে, "বিবাহ পূর্ব প্রেম হারাম" নয়, কিন্তু এখানে হারাম ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে- এ জন্য "বিবাহ পূর্ব প্রেম হারাম"। তাদের যুক্তির বিপরীতে উত্তর খুবই সহজ- বিবাহতেও হারাম ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। যেমন- যৌনমিলনের সময় স্ত্রীর পায়ুপথ ব্যবহার, Period এর সময় যৌনমিলনের সম্ভাবনাও আছে। তাহলে কি এখন "বিবাহও হারাম"??
খ) সবচেয়ে বেশি প্রেম আল্লাহ'র জন্য হওয়া উচিৎ (2:265), তাই "বিবাহ পূর্ব প্রেম হারাম। এই যুক্তির বিপরীতে উত্তর সহজ- তাহলে তো বিবাহও হারাম, কারণ অনেকেই বৌকে অনেক ভালোবাসে!! ভাই, এ সব গাঁজাখুরি যুক্তি গাঁজাখোরদের দেবেন, হোসেন কুরানীকে নয়!! বুঝলেন বোকার সর্দার??
৩) মুখ খুলে রাখা হারাম, পুরো মুখ ঢাকতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ মুখ খুলে রাখতে বলেছেন একেবারে সুস্পষ্ট ভাবে ও পরিষ্কার ভাষায়, দেখুন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا●
অনুবাদ হবে এমন-"হে সম্মানিত মানুষ, নিশ্চয়ই আমরা তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। এবং তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন প্রদেশ ও বিভিন্ন গোত্রে, যেন একে অপরের পরিচয় পাও"(49:13)। এ খানে কেউ বলতে পারেন- কই মুখ খুলে রাখার কথা তো আল্লাহ বলেন নি?? এটা তো হিজাব বা পর্দা সম্পর্কিত আয়াহ'ই নয়!! উত্তর সহজ- এখানে বলা হচ্ছে لِتَعَارَفُوا (লিতায়ারাফু), যার অর্থ "যেন তোমরা একে অপরের পরিচয় পাও বা একে অপরকে চিনতে পারও"। এখন প্রশ্ন হল- যদি আপনি মুখ ঢেকে রাখেন, তাহলে মানুষ আপনাকে চিনবে কিভাবে?? এ জন্য "হিজাব বা পর্দায় মুখ খুলে রাখতে হবে, মুখ ঢাকা হারাম"। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ঐ শাইত্বান আলিম গুলো মুখ খুলে রাখা হারাম ঘোষণা করে রেখেছেন!!
৪) হস্তমৈথুন হারাম। এখন হস্তমৈথুন হারাম কিনা, সে বিষয়ে পরে আলোচনা করব- ইনশায়াআল্লাহ। আপনি আয়াহ'টা দেখুন- وَقَدْ فَصَّلَ لَكُمْ مَا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ অনুবাদ হবে এমন-"এবং নিশ্চয়ই তোমাদের ওপর যা হারাম, তা তিনি বিস্তারিত ভাবে বলে দিয়েছেন"(6:119)। আর হস্তমৈথুন হারাম মর্মে কোনও আয়াহ পবিত্র কুরআনে নেই এবং হাদীশ ভান্ডারে এমন কোনও সাহীহ ও হাসান হাদীশও নেই। যদিও ঐ শাইত্বান আলিম গুলো যখন দালায়িল দিতে ব্যর্থ হন, তখন যুক্তি দিয়ে বলেন- তাহলে বিবাহ করার দরকার কি?? উত্তর সহজ- হস্তমৈথুন বিবাহের 5-10% মাত্র। সুতরাং হস্ত মৈথুন বিবাহের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম নয়। তাই হস্ত মৈথুন হালাল হওয়া সত্ত্বেও বিবাহ ফারাদ্ব (4:3)।
সুধী পাঠক, আমাদের মনে হয়- আমরা আপনাকে এটা দেখাতে সামর্থ্য হয়েছি যে, ইসলাম খুবই সহজ-সরল একটা জীবন ব্যবস্থা। কিন্তু ঐ শাইত্বান আলিম গুলো আল্লাহ'র প্রেরিত ও রাসূল (স্বা)- এর রেখে যাওয়া ইসলাম গোপন করে একটা "নকল ইসলাম" সমাজে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এর ফল স্বরূপ "ইসলাম কঠিন মনে হয়"। যাইহোক, যদি এক কথায় বলা হয় যে, সহজ-সরল পথ কোনটা!! তাহলে এ প্রশ্নের উত্তর কি হবে?? এ প্রশ্নের উত্তর ঈশা (আ) দিয়ে ছেন- إِنَّ اللَّهَ هُوَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ ۚ هَٰذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٌ অনু বাদ হবে এমন-"নিশ্চয়ই আল্লাহই আমার এবং তোমাদের রাব/ প্রভু/ প্রতিপালক। সুতরাং তারই ইবাদাত করো। এটাই সহজ-সরল পথ"(3:51, 19:36 ও 43:64)। আর আল্লাহ'র ইবাদাতই ইসলাম এবং ইসলাম পালন করাই আল্লাহর ইবাদাত। তাই তো আল্লাহ পবিত্র কুরআনে খুব গুরুত্ব সহ বলেছেন- وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ অনুবাদ হবে এমন-"এবং আমি জিন ও মানুষজাতি সৃষ্টি করেছি, আমার ইবাদাত করা ছাড়া অন্য কোনও উদেশ্য নয়"(51:56)।
1:5 আয়াহ, কুরানী বিশ্লেষণ 4)
"সঠিক পথ" বলতে কি?? এ ছাড়াও আল্লাহ কি ভুল পথ দেখাতে পারেন, যে "সঠিক পথ" দেখাতে বলা হচ্ছে?? উত্তর সহজ, দেখুন- وَعَلَى اللَّهِ قَصْدُ السَّبِيلِ وَمِنْهَا جَائِرٌ অনুবাদ হবে এমন-"পথ দেখানোর দায়িত্ব আল্লাহর। কেননা, বাঁকা পথ তো রয়েছে"(16:9)। এ ছাড়াও পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলে ছেন- هَٰذَا صِرَاطٌ عَلَيَّ مُسْتَقِيمٌ অনুবাদ হবে এমন-"এই সহজ সরল পথই আমার পর্যন্ত পৌঁছায়"(15:41)। আল্লাহ আরও বলেছেন- وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ অনুবাদ হবে এমন-"এই পথ বাদ দিয়ে অন্য পথ অনুসরণ করো না, তা হলে তা তোমাদেরকে তার সহজ-সরল পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে"(6:153)।
1:5 মূল আয়াহ, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও কুরানী বিশ্লেষণ:-
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ●
পবিত্র কুরআনে اهْدِنَا (ইহিদ'না) বা "আমাদের পথ দেখান" কালিমাহ'টি 2 বার মতো ব্যবহৃত হয়েছে, এর মধ্যে 1 বার তো এখানেই, দ্বিতীয় বার 38:22 আয়াহ'তে। আর হ্যাঁ, বলে রাখা ভালো হবে যে, الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ (আস্ব স্বিরাতাল মুস্তাকীম) কালিমা 2 টিও পবিত্র কুরআনে 2 জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে 1:5 আয়াহ সহ 37:118 আয়াহ'তে। প্রশ্ন হবে- পবিত্র কুরআনে اهْدِنَا (ইহিদ'না) বা "আমাদের পথ দেখান" 2 বার ব্যবহৃত হয়েছে কেন?? উত্তর সহজ- পথ সাধারণত 2 টি হয়ে থাকে। যা, বর্ণিত হয়েছে 16:9 আয়াহ তে। তার মধ্যে আমরা পরোক্ষভাবে আল্লাহ'র থেকে সঠিক পথ প্রার্থনা করছি। এবার প্রশ্ন হবে- الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ (আস্ব স্বিরাতাল মুস্তাকীম) কালিমা'টি 2 বার ব্যবহৃত হয়েছে কেন?? উত্তর সহজ- 2 টি পথের মধ্যে আল্লাহ'র থেকে "সহজ-সরল সঠিক" পথটা পরোক্ষভাবে চাইছি।
তবে পাঠক, এখানে লক্ষণীয় একটা বিষয় আমরা এড়িয়ে চলে এসেছি এবং তা হল- اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ অনুবাদ হবে এমন-" আমাদেরকে পথ দেখান, যা সহজ-সরল এবং সঠিক"(1:5)। প্রশ্ন হবে- সেই "লক্ষণীয় একটা বিষয়" কি, যা আমরা এড়িয়ে চলে এসেছি?? উত্তর সহজ- তা হল 1:5 নং আয়াহ'টি। মানে?? মানে হল- 1:5 নং আয়াহ'তে বলা হচ্ছে যে, "আমাদেরকে পথ দেখান, যা সহজ-সরল ও সঠিক"। এতে কি আছে?? যা আছে, তা হল- 1 নং সূরাহ'র 5 নং আয়াহ। আর এ জন্যেই আমরা প্রতিদিন 5 বার 5 ওয়াক্ত স্বালাত এ আল্লাহ'র কাছে প্রার্থনা করি-"আমাদেরকে পথ দেখান, যা সহজ-সরল এবং সঠিক"(1:5)।
চলতেই থাকবে.................
প্রকাশ কাল : 19.01.2022
© হোসেন কুরানী।