কোরানে কি পরস্পর বিরোধী কথা আছে??

 


    Whatsapp- এ  হাওড়ার  টিকিয়া  পাড়ার  সিরাজুল ইসলাম ভাই প্রশ্ন  করে বলেছেন-"হোসেন স‍্যার, আমার একজন  নাস্তিক  বন্ধু আছে, যার প্রশ্ন আপনাকে প্রায়ই পাঠাই, তিনি কোরান থেকে  কয়েকটি পরস্পর বিরোধী কথা বের করেছে!! স‍্যার, দয়া  করে  তার  প্রশ্ন  গুলোর দিবেন। কেননা, আমার দৃষ্টিতে এই ধরণের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র আপনার  মধ্যেই দেখতে পাই। সুতরাং  তার  সমস্ত  প্রশ্নের  যথাযথ   উত্তর   দিন  এবং কোরানকে তাদের থেকে কটাক্ষ মুক্ত করুন। আর, এটা শুধুমাত্র আপনিই পারবেন স‍্যার"।

   হ‍্যাঁ ইনশাআল্লাহ, ঐ   নাস্তিকের   সমস্ত   প্রশ্নের উত্তর দেব- ইনশাআল্লাহ। তার   আগে  একটু বলে  নিতে  চাই যে, ঐ  নাস্তিকের   সমস্ত   প্রশ্ন   গুলো   সিরাজুল   ভাই পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু  প্রশ্নটা  বড় হয়ে যাবে বলে আমিই তা উপরিউক্ত প্রশ্নের সঙ্গে  উল্লেখ  করি নি। পরে  আমি ঐ নাস্তিকের  সমস্ত  প্রশ্ন  গুলো উল্লেখ করে উত্তর দিয়ে দেব- ইনশাআল্লাহ। তবে, প্রশ্ন   গুলো  এসেছে  সাধারণ ভাবে, রেফারেন্স   ছাড়া। আমি   প্রশ্ন  গুলোকে  নিজের মত করে রেফারেন্স সহ সাজিয়ে নিয়েছি।

   #উত্তর:::- কোরানে    কি    পরস্পর    বিরোধী   কথা আছে?? কোরানে  কি  পরস্পর  বিরোধী  কথা থাকতে পারে?? এ  প্রশ্নের  উত্তর  কোরানেই  আল্লাহ  দিয়েছেন এভাবে-  لَا يَضِلُّ رَبِّي وَلَا يَنْسَى   অনুবাদ হবে এমন-"প্রভু ভুল করেন না, ভুলেও  যান না"(20:52)। এখানেই  শেষ নয়, আরও কি বলা হয়েছে দেখুন-

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا

অনুবাদ হবে এমন-"তারা  কি  কোরান  সম্পর্কে   চিন্তা-ভাবনা  করে  না?? যদি এটি আল্লাহ‌ ছাড়া অপর কারো পক্ষ  থেকে হত, তাহলে  তারা  এর  মধ্যে  বহু  পরস্পর বিরোধী কথা এবং অসঙ্গতি খুঁজে পেত"(4:82)। আরও বলা হয়েছে এভাবে-

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا

অনুবাদ হবে এমন-"তারা কি কোরান নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে নি, না কি  তাদের  চিন্তা  শক্তির  উপর তালা মারা আছে"(47:24)??

   যাইহোক, এবার  আলোচনা   করব   যে, অসঙ্গতি  বা পরস্পর  বিরোধী  কথা  কাকে  বলে!! একই  বিষয়ে  2 স্থানে 2 রকম  বর্ণনাকে  অসঙ্গতি  বা  পরস্পর বিরোধী কথা বলে। কিন্তু  এখন  প্রশ্ন  হল- কোরানে কি পরস্পর    বিরোধী  কথা আছে?? কোরানে  কি  পরস্পর  বিরোধী  কথা থাকতে পারে?? এ প্রশ্নের উত্তর কোরানেই আল্লাহ  দিয়েছেন এবং চ‍্যালেঞ্জ করেছেন এভাবে-

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا

অনুবাদ হবে এমন-"তারা  কি  কোরান  সম্পর্কে   চিন্তা-ভাবনা  করে  না?? যদি এটি আল্লাহ‌ ছাড়া অপর কারো পক্ষ  থেকে হত, তাহলে  তারা  এর  মধ্যে  বহু  পরস্পর বিরোধী কথা এবং অসঙ্গতি  খুঁজে  পেত"(4:82)। এখন আমিও  চ‍্যালেঞ্জ  করতে  পারি- কোরানে   অসঙ্গতি  বা পরস্পর  বিরোধী  কথা  আছে  বলে  যদি  কেউ  প্রমাণ করতে  পারেন, তাহলে  আমি (লেখক, হোসেন  কুরানী) ইসলাম ত‍্যাগ করব- ইনশাআল্লাহ!!

   কিন্তু প্রশ্ন হবে-"তাহলে  অনেক  নাস্তিক   যে   কোরান থেকে অসঙ্গতি বা পরস্পর বিরোধী কথা  বের  করে, এ বিষয়ে আপনি কি বলবেন"?? আমি বলব-"যাদের গায়ে জ্ঞান নেই কিন্তু চুলকানিতে ভর্তি" তারাই কোরান  থেকে অসঙ্গতি  বা  পরস্পর বিরোধী কথা বের করে!! তাদের জন্য যোগ্য উত্তরইইইই হল  আমার  এই  লেখা!! একটা কথা মনে পড়ছে বলব?? আমি যখনই "গায়ে জ্ঞান নেই কিন্তু চুলকানিতে ভর্তি"- কথাটা বলতাম, তখন  হানীজি এ কথা শুনে  খুব হাসত!! যাইহোক, এবার  নাস্তিকদের মিথ্যা   অভিযোগ   ও    অপবাদ   এবং   তাদের   মিথ্যা অভিযোগ ও অপবাদের খন্ডন দেখুন-

1) আকাশ  বা  আগে  সৃষ্টি  করা  হয়েছে, নাকি  পৃথিবী আগে সৃষ্টি করা হয়েছে?? এ বিষয়ে  কোরানে 2 স্থানে 2 রকম   কথা   বলা   হয়েছে, যেমন  2:29  আয়াতে  বলা হয়েছে- পৃথিবী আগে সৃষ্টি করা হয়েছে তারপর আকাশ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং 79:27-30 আয়াতে বলা হয়েছে- আকাশ  আগে  সৃষ্টি  করা  হয়েছে  তারপর পৃথিবী সৃষ্টি করা  হয়েছে!! এখানে  2:29  আয়াত  বৈজ্ঞানিক  ভাবে ভুল  এবং  2:29  ও  79:27-30 আয়াত হল- কোরানের অসঙ্গতি বা পরস্পর বিরোধী তথ্য।

   সুধী পাঠক, অভিযোগ  ও  অপবাদের পালা শেষ, এই বার উত্তর তাদের উত্তর দিতে চাই। প্রথমে আপনি 2:29 আয়াতটি দেখুন-

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَىٰ إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ ۚ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

অনুবাদ হবে এমন-"তিনিই  পৃথিবীতে   তোমাদের  জন্য সমস্ত  জিনিস  সৃষ্টি  করলেন। তারপর আকাশের দিকে লক্ষ করলেন এবং সাত আকাশ বিন্যস্ত  করলেন। তিনি সব   জিনিসের    জ্ঞান    রাখেন"(2:29)। হ‍্যাঁ, আয়াতটি দেখলেই এটা মনে হচ্ছে যে- পৃথিবী  আগে  সৃষ্টি হয়েছে এবং  আকাশ  তারপর  সৃষ্টি  হয়েছে। কিন্তু  আকাশ  বা মহাবিশ্বের  আগে  কি  পৃথিবীর  সৃষ্টি   হতে   পারে?? এ প্রশ্নের  উত্তর  হল- না, আকাশ   বা   মহাবিশ্বের   আগে পৃথিবী  সৃষ্টি  হতে  পারে  না!! কেননা, মহাবিশ্বের  বয়স প্রায়  1500  কোটি বছর এবং পৃথিবীর বয়স 450-460 কোটি  বছর। সুতরাং  আপাত   দৃষ্টিতে   2:29   আয়াত বৈজ্ঞানিক  ভাবে  ভুল  বলে  মনে  হচ্ছে। তাই ন?? কিন্তু আকাশ মানে কি মহাবিশ্ব?? যদি উক্ত আয়াতে আকাশ বলতে  মহাবিশ্বকে  বোঝানো  হয়ে   থাকে, তাহলে  তো বলতেই হবে- উক্ত আয়াত বৈজ্ঞানিক ভাবে ভুল!!

   কিন্তু  আমরা  জানি  যে- কোরানে شمء  (সামায়া)  বা আকাশ  শব্দটি  ব‍্যাপক  অর্থে  ব‍্যবহৃত হয়েছে, কোনও নিদিষ্ট  অর্থে  ব‍্যবহৃত  হয় নি। চাইলে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে দেখতে পারেন---

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=737114936673506&id=544853392566329

   আমরা  এও  জানি  যে, 21:32  আয়াতে  شمء বলতে বায়ুমণ্ডলকে  মেনশন  করা  হয়েছে, ঠিক  তেমনি  2:29 আয়াতে شمء বলতে মহাবিশ্বকে  মেনশন  করা  হয়েছে। চাইলে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে দেখুন---

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=625618987823102&id=544853392566329

   পাঠকগণ, এবার যদি 2:29  আয়াতে شمء বা আকাশ অর্থে বায়ুমণ্ডল অনুবাদ  করেন, তাহলেই  সমস্যা  শেষ।প্রশ্ন  হতে  পারে-"আমি  কি شمء শব্দের  অর্থ বায়ুমণ্ডল গায়ের জোরে  করছি"?? এ  প্রশ্নের  হল- না,  অনুবাদটি দেখুন, বুঝতে  পারবেন  যে, এটাই  মানানসই  অনুবাদ। সুতরাং এবার আয়াতটি দেখুন-

هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَىٰ إِلَى السَّمَاءِ فَسَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ ۚ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

অনুবাদ হবে এমন-"তিনিই  পৃথিবীতে   তোমাদের  জন্য সমস্ত  জিনিস  সৃষ্টি  করলেন। তারপর  আকাশ  বা বায়ু মণ্ডলের দিকে লক্ষ  করলেন  এবং  তাকে সাত আকাশ বা সাত স্তরে বিন্যস্ত করলেন। তিনি সব জিনিসের জ্ঞান    রাখেন"(2:29)।

   সুধী পাঠক, এবার বলুন- আগে  তো  পৃথিবী সৃষ্টি হবে তারপরেই  তো  তার উপর বায়ুমণ্ডল সৃষ্টি হবে, তাই তো নাকি?? তাহলে  উপরিউক্ত  আয়াতে   বৈজ্ঞানিক   ভুল কোথায়?? বরং  উক্ত  আয়াত  বিজ্ঞান  সম্মত, কিভাবে জানেন?? উক্ত   আয়াতে   বায়ুমণ্ডলকে  7  স্তরের  বলা হয়েছে, যা   বিজ্ঞান   জেনেছে   মাত্র  100  বছর  আগে অথচ  কোরান   আমাদেরকে   জানিয়েছে  1500  বছর আগে। তাই নয় কি??

   এ বিষয়ে প্রথম অভিযোগ ও অপবাদ খন্ডন হল এবং এ  বিষয়ে  দ্বিতীয়  অভিযোগ  ও  অপবাদ হল- 2:29 ও 79:27-30  আয়াত পরস্পর বিরোধী!! তাই তো?? সুধী পাঠক, 2:29 আয়াতের অনুবাদ  ও  ব‍্যাখ‍্যা আমরা পূর্বে দেখেছি, এবার দেখব- 79:27-30 আয়াত  গুলো। চলুন এবং দেখুন-  أَأَنْتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاءُ ۚ بَنَاهَا  অনুবাদ হবে এমন-"তোমাদের সৃষ্টি করা বেশি কঠিন কাজ, না আকা শের?? আল্লাহই তাকে  সৃষ্টি করেছেন"(79:27)। আরও দেখুন-    رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوَّاهَا    অনুবাদ  হবে  এমন-"তিনি তাকে  (আকাশকে)  বিভিন্ন  প্রকারের  ও  নিয়মতান্ত্রিক করলেন"(79:28)। আরও দেখুন-     وَأَغْطَشَ لَيْلَهَا وَأَخْرَجَ ضُحَاهَا অনুবাদ হবে এমন-"এবং তিনি রাতকে অন্ধকার ও দিন আলোকজ্বল  করলেন"(79:29)। আরও  দেখুন-

وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَٰلِكَ دَحَاهَا

অনুবাদ হবে এমন-"এরপর    তিনি     পৃথিবীকে     সৃষ্টি করেছেন 'উটপাখির'  ডিমের আকৃতিতে"(79:30)। সুধী পাঠক, উপরিউক্ত  4  টি আয়াত হতে এটা পরিষ্কার যে, আগে আকাশ সৃষ্টি করা হয়েছে তারপর পৃথিবী। তাহলে কি এই 4 টি আয়াত  এবং  2:29  আয়াত  সাংঘর্ষিক?? না, উক্ত  আয়াত  2  টা  সাংঘার্ষিক   নয়। কেননা, 2:29 আয়াত  পৃথিবী  ও  তার  উপর  বায়ুমণ্ডল  তৈরীর কথা বলছে এবং 79:27-30 আয়াতে মহাবিশ্ব তথা  গ‍্যালাক্সি সমূহ  সৃষ্টির  কথা   বলে  তারপর   পৃথিবী   সৃষ্টির  কথা বলছে এবং এটাই তো বিজ্ঞান বলে!! তাই না??

   হ‍্যাঁ, সুধী     পাঠক, হ‍্যাঁ। উক্ত     79:27-30     আয়াতে আকাশ  বলতে  মহাবিশ্ব তথা বিভিন্ন প্রকার গ‍্যালাক্সির সমম্বয়ে   মহাবিশ্ব  সৃষ্টির  পর  পৃথিবী  সৃষ্টির  কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ   উক্ত   আয়াতে   আকাশ   বলতে   মহা বিশ্বকে   মেনশন   করা  হয়েছে। ঠিক  যেমন  51:47 এ আকাশ  বলতে  মহাবিশ্বের  প্রাথমিক অবস্থাকে নির্দেশ করা   হয়েছে!! সুধী   পাঠক, এবার    আমরা    আয়াত গুলোকে  এভাবে  অনুবাদ  করব, তাহলেই সমস্যা শেষ হয়ে যাবে- ইনশাআল্লাহ!! দেখুন-

"তোমাদের  সৃষ্টি  করা বেশি কঠিন, না মহাবিশ্ব?? তিনি তা    (মহাবিশ্ব)    সৃষ্টি     করলেন"(79:27)। তিনি    মহা বিশ্বকে   বিভিন্ন   প্রকারের   গ‍্যালাক্সি সহ নিয়মতান্ত্রিক করলেন"(79:28)। এবং  তিনি রাতকে অন্ধকার ও  দিন আলোকজ্বল করলেন"(79:29)। এরপর পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন 'উটপাখির' ডিমের আকৃতিতে"(79:30)।

   সুধীপাঠক, 2:29 এবং 79:27-30 আয়াত  সাংঘর্ষিক, না কি 2 টি আয়াত ভিন্ন ভিন্ন  বিষয়ে  কথা  বলছে?? এ বিষয়ে বিচার না করেই উত্তর দিন!! দেবেন তো??

2) আকাশ  ও  পৃথিবী  6  দিনে  সৃষ্টি  হয়েছে, না  কি  8 দিনে?? এ বিষয়ে কোরানে  2  স্থানে  2 রকম কথা বলা হয়েছে। যেমন- 7:54, 11:7, 10:3, 25:59, 50:38, 57:4 আয়াতে বলা হয়েছে- মহাবিশ্ব 6 দিনে সৃষ্টি হয়েছে এবং 41:9-12 তে বলা হয়েছে- মহাবিশ্ব  8 দিনে সৃষ্টি হয়েছে।সুতরাং কোনটা ঠিক??

   সুধী পাঠক, এ বিষয়ে আর নতুন করে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কেননা, বেশ কিছু দিন আগে  এ  প্রশ্নের উত্তর   দিয়েছিলাম। নিচে   সেই  উত্তরের  লিঙ্ক  দিলাম। লিঙ্কে  ক্লিক  করে  অবাক  করা  সেই   উত্তরটি   পড়তে পারেন। বলে    রাখা   দরকার   যে, বিজ্ঞানের   সাহায্যে কোরান ব‍্যাখ‍্যা কিভাবে করতে হয়, তা উক্ত  লিঙ্কে ক্লিক করলে দেখতে পাবেন---

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=791936511191348&id=544853392566329

3) কোরান  সমগ্র  মানব  জাতির  জন্য, না  কি শুধুমাত্র আরব  বিশ্বের  জন্য?? এ  বিষয়ে  কোরানে  2  স্থানে  2 রকম  কথা বলা হয়েছে। যেমন- 6:92 ও 42:7 আয়াতে বলা  হয়েছে- কোরান  আরব  ভূমি ও তার আশেপাশের মানুষদের  জন্য  এবং  2:185   আয়াতে   বলা  হয়েছে- কোরান  সমগ্ৰ   মানব   জাতির   জন‍্য। এখানে  কোনটা ঠিক??

   সুধী পাঠক, এ  বিষয়ে  আমরা  এবার  উত্তরের দিকে এগিয়ে  যাব  কিন্তু  তার আগে দেখে নিতে চাই। আয়াত গুলো দেখুন-

وَكَذَٰلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لِتُنْذِرَ أُمَّ الْقُرَىٰ وَمَنْ حَوْلَهَا وَتُنْذِرَ يَوْمَ الْجَمْعِ لَا رَيْبَ فِيهِ ۚ فَرِيقٌ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ

অনুবাদ হবে এমন-"এভাবেই আমি এই আরবি  কোরান ওহী  করে  আপনার  কাছে   পাঠিয়েছি, যাতে   আপনি জনপদসমূহের কেন্দ্র (মক্কা নগরী) ও তার আশেপাশের অধিবাসীদের  সতর্ক  করে দিন  এবং  একত্রিত হওয়ার দিন সম্পর্কে ভয় দেখান!! যার আগমনে কোনও সন্দেহ নেই। এক দলকে জান্নাতে যেতে হবে এবং অপর দলকে যেতে হবে দোজখে"(42:7 ও 6:92)। আরও দেখুন-

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ 

অনুবাদ হবে এমন-"রামজান  মাস, এই মাসেই  কোরান নাযিল করা হয়েছে, যা  মানব জাতির জন্য  পথপ্রদর্শক এবং সত‍্য-মিথ্যার পার্থক্য সুস্পষ্ট কারি"(2:185)।

   হ‍্যাঁ, আপাত  দৃষ্টিতে  দেখলে 42:7  ও  6:92 এ 2:185 আয়াত পরস্পর বিরোধী কথা বলছে  কিন্তু  তা মোটেও নয়। কেননা, 42:7 ও 6:92 আয়াতে আরবিতে  কোরান নাযিলের  "কারণ"  বলা  হয়েছে। চাইলে 42:7  ও  6:92 আয়াতের  সঙ্গে  19:97   আয়াতটিও   দেখতে  পারেন। যেখানে বলা হয়েছে-

فَإِنَّمَا يَسَّرْنَاهُ بِلِسَانِكَ لِتُبَشِّرَ بِهِ الْمُتَّقِينَ وَتُنْذِرَ بِهِ قَوْمًا لُدًّا

অনুবাদ হবে এমন-"এ বাণীকে  আপনার  ভাষায়  সহজ করে   দিয়েছি। যাতে   আপনি   মুত্তাকীদেরকে   সুখবর দিতে ও হঠকারীদেরকে ভয় দেখাতে পারেন"(19:97)।

   সুধী পাঠক, উপরিউক্ত  42:7  ও  6:92  এবং  19:97 আয়াতে  আরবি   ভাষায়   কোরান   নাযিলের  "কারণ" বর্ণিত  হয়েছে  যে, যাতে  কোরান  নবী (স) এবং আরব বিশ্বের  মানুষজনরা  বুঝতে   পারেন!! আর, এ   বিষয়ে কোরানে আল্লাহ আরও বলেছেন এভাবে-

إِنَّا جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ

অনুবাদ হবে এমন-"আমি একে আরবি  ভাষার কোরান বানিয়েছি, যাতে তোমরা তা বুঝতে  পার"(43:3)। এটাই শেষ নয়, আরও দেখুন-

وَلَوْ جَعَلْنَاهُ قُرْآنًا أَعْجَمِيًّا لَقَالُوا لَوْلَا فُصِّلَتْ آيَاتُهُ ۖ أَأَعْجَمِيٌّ وَعَرَبِيٌّ ۗ قُلْ هُوَ لِلَّذِينَ آمَنُوا هُدًى وَشِفَاءٌ ۖ وَالَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ فِي آذَانِهِمْ وَقْرٌ وَهُوَ عَلَيْهِمْ عَمًى ۚ أُولَٰئِكَ يُنَادَوْنَ مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ

অনুবাদ হবে এমন-"আমি   যদি   কোরানকে    অনারবি ভাষায়   পাঠাতাম, তাহলে   এসব  লোকেরা  বলত- এর আয়াতসমূহ  সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয় নি কেন?? কি আশ্চর্য  কথা, অনারবি  বাণীর  শ্রোতা   আরবি   ভাষা-ভাষী!! এদের   বলুন- এই   কোরান    মুমিনদের    জন্য হিদায়াত  ও  রোগমুক্তি বটে। কিন্তু যারা ঈমান আনে না এটা  তাদের  জন্য  পর্দা   ও   চোখের   আবরণ। তাদের অবস্থা  হচ্ছে  এমন, যেন  দূর  থেকে   তাদেরকে   ডাকা হচ্ছে"(41:44)।

   এককথায়, যেহেতু বিশ্বনবী (স)- কে আরবে  পাঠানো হয়েছিল, সেহেতু কোরানকে তাদের ভাষায় নাযিল করা হয়েছিল। তা না হলে বিশ্বনবী  তাদেরকে  বোঝাবেন কি করে!! এই হল 42:7 ও 6:92 আয়াতের  প্রসঙ্গ। এখানে 42:7 ও 6:92 আয়াতের অর্থ এই  নয়  যে, কোরান  শুধু মাত্র আরব বিশ্বের জন্য!!

   এছাড়াও  কোরানকে  যদি  হিন্দি  ভাষায় নাযিল করা হত, তবুও তো কেউ  কেউ  বলত  যে, কোরান  শুধুমাত্র ভারতের  জন্য!! তাই  না?? যদি   কোরানকে   ইংরেজি ভাষায় নাযিল করা হত, তাহলেও  কেউ কেউ বলত যে, কোরান শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষা-ভাষির জন্য!! তাই  নয় কি?? তাই, কোনও  না  কোনও  ভাষায় তো কোরানকে নাযিল  করতে  হবে, এক্ষেত্রে  কোরানের  ভাষা  হিসাবে আল্লাহ আরবিকে পছন্দ করেছেন!! তবে, আল্লাহ  কেন কোরানকে আরবিতে নাযিল করলেন- এ প্রশ্নের অনেক গুলো   কারণের   মধ্যে   একটি   "কারণ"   নিচের লিঙ্কে উল্লেখ  করা  হয়েছে  এবং  এটাই  সব চেয়ে   গুরুত্বপূর্ণ "কারণ" গুলোর অন‍্যতম "কারণ"। সুতরাং নিচের  লিঙ্কে ক্লিক করে দেখুন---

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=708167052901628&id=544853392566329

   যাইহোক, এই  42:7  ও  6:92  আয়াত  2 টি কখনোই এটা  বলছে  না  যে, কোরান   শুধুমাত্র   আরব   বিশ্বের জন্য!! বরং উক্ত  2  আয়াতে আরবিতে কোরান নাযিল করার   সাধারণ   "কারণ"    বলা    হয়েছে। তাই, 2:185 আয়াতটি  কখনও   42:7   ও   6:92 আয়াতের বিরুদ্ধে যাচ্ছে না। বরং  উপরিউক্ত  2:185  এবং 42:7 ও 6:92 আয়াতে  বলা  হচ্ছে- যেহেতু  নবী  (স)  পাঠানো হয়েছে আরবে অর্থাৎ  এশিয়া, আফ্রিকা  ও  ইউরোপের  কেন্দ্র আরবে, সেহেতু  তার  কাছে   কোরান   আরবি   ভাষায় নাযিল করা হয়েছে  কিন্তু  কোরানের  পথনির্দেশ  সমগ্র মানবজাতির জন্য। এছাড়াও দেখুন-

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ

অনুবাদ হবে এমন-"আমি  আপনাকে  মহাবিশ্ব  সমূহের জন্য রহমত স্বরুপ করে"(21:107)।

4) আল্লাহর  একদিন   আমাদের   হিসাবে 1,000  (এক হাজার) বছর, না কি 50,000  (পঞ্চাশ হাজার) বছর?? এ বিষয়ে কোরানে 2  স্থানে  2 রকম  কথা বলা হয়েছে। যেমন- 70:4  আয়াতে  বলা  হয়েছে- আল্লাহর  একদিন তোমাদের  হিসাবে  50,000  বছর এবং 22:47 ও 32:5 আয়াতে   বলা   হয়েছে- আল্লাহর   একদিন   তোমাদের হিসাবে 1,000 বছর। এখানে কোনটা ঠিক??

   সুধী পাঠক, এ  বিষয়ে  উত্তর  দেওয়ার  পূর্বে  আয়াত গুলো   দেখে    নিন, তাহলেই    পরিষ্কার    হয়ে    যাবে- ইনশাআল্লাহ। এবং পরে  হয়ত  আমাকে আর সে রকম কিছু বলতেই হবে না!!

تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ

অনুবাদ হবে এমন-"ফেরেস্তরা  এবং   রুহ   তার   দিকে উঠে যায় এমন এক দিনে যা তোমাদের  হিসাবে  পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান"(70:4)। আরও দেখুন-

وَيَسْتَعْجِلُونَكَ بِالْعَذَابِ وَلَنْ يُخْلِفَ اللَّهُ وَعْدَهُ ۚ وَإِنَّ يَوْمًا عِنْدَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِمَّا تَعُدُّونَ

অনুবাদ হবে এমন-"তারা   আযাবের   জন্য   তাড়াহুড়ো করছে?? আল্লাহ  কখনও তার প্রতিশ্রুতি  ভঙ্গ  করবেন না। কিন্তু আপনার প্রভুর কাছের একটি দিন  তোমাদের গণনার  হাজার  বছরের  সমান হয়"(22:47)। এছাড়াও আরও দেখুন-

يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ أَلْفَ سَنَةٍ مِمَّا تَعُدُّونَ

অনুবাদ হবে এমন-"তিনি   মহাবিশ্বের   যাবতীয়   বিষয় পরিচালনা করেন ও  পরে  তার কাছে একদিন উপনীত হবে, যার  পরিমাণ  হবে  তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান(32:5)।

   সুধী পাঠক, এবার   একটা  প্রশ্ন-"3   টি   আয়াত   কি একই  বিষয়ে  ভিন্ন  ভিন্ন  কথা  বলছে, না  কি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন  ভিন্ন কথা বলছে"?? উত্তর এটাই হবে যে, 3 টি  আয়াত  ভিন্ন  ভিন্ন  বিষয়ে  ভিন্ন  ভিন্ন  কথা  বলছে। যেমন- 70:4 আয়াতে  বিচার  দিনের কথা বলা হয়েছে। আর, 22:47  ও  32:5  আয়াতে  বর্তমান  সময়ের  কথা বলা  হয়েছে। তাই, 22:47  ও  32:5 এবং  70:4 আয়াত মোটেও পরস্পর বিরোধী নয়!! বুঝেছেন??

   উপরিউক্ত  3  আয়াত  থেকে  আরও বোঝা গেল যে- বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সময়ের আপেক্ষিকতার থিওরি সত্য। কেননা, উপরিউক্ত    3   আয়াতও   বলছে- সময় আপেক্ষিক। অর্থাৎ   সময়ের   গতি   সর্বদা  সমান  নয়। স্থান, কাল, পাত্র  ভেদে  সময়ের  গতি  হয়  ভিন্ন   ভিন্ন!! কিছু বুঝলেন কি?? এগুলো  বুঝতে  হলে একটু বিজ্ঞান জানতে  হবে!! কোরানে  আল্লাহ   এ   বিষয়ে   পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করেছেন-            تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْحَكِيمِ

অনুবাদ   হবে   এমন-"এগুলো   বিজ্ঞানময়   কোরানের আয়াত"(31:2 ও 36:2)। আরও দেখুন-

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ

অনুবাদ হবে এমন-"তিনিই  মহান  সত্তা, যিনি  উম্মীদের মধ্যে  তাদেরই  একজনকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদেরকে    তার    আয়াত    শুনায়, তাদের    জীবনকে সজ্জিত ও সুন্দর করে  এবং  তাদেরকে আল্লাহ প্রেরিত  এবং  বিজ্ঞান  শিক্ষা  দেয়। অথচ  ইতিপূর্বে  তারা  স্পষ্ট অবৈজ্ঞানিক গোঁড়ামিতে নিমজ্জিত ছিল"(62:2)। এটাই কি শেষ?? না, আরও দেখুন-

ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ

অনুবাদ   হবে   এমন-"মানুষকে    প্রভুর   দিকে   ডাকুন বিজ্ঞানসম্মত ভাবে, তাদের সদুপদেশ দিন এবং  তাদের সঙ্গে তর্ক করুন  উত্তম  পন্থায়"(16:125)। কিন্তু  দুর্ভাগ্য জনক     হলেও   সত্য   যে, আমাদের   আলেম   সমাজ বিজ্ঞানের "ব" জানেন না!!

 5) মারিয়ামের  কাছে  একজন  ফেরেস্তা  এসেছিল, না কি একাধিক ফেরেস্তা  এসেছিল?? এ  বিষয়ে  কোরানে 2 স্থানে 2 রকম কথা বলা হয়েছে। যেমন- 3:42 ও 3:45 আয়াতে    বলা    হয়েছে- ফেরেস্তারা    মানে   একাধিক ফেরেস্তা  মারিয়ামের  কাছে  এসেছিল  এবং 19:17 নং আয়াতে  বলা  হয়েছে- শুধুমাত্র  রুহ  বা জিব্রাঈল (আ) মারিয়ামের কাছে এসেছিল‌। এখানে কোনটা ঠিক??

   সুধী পাঠক, উত্তর  পরে   দিচ্ছি- ইনশাআল্লাহ। প্রথমে আয়াত গুলো দেখে নিন-

وَإِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاكِ وَطَهَّرَكِ وَاصْطَفَاكِ عَلَىٰ نِسَاءِ الْعَالَمِينَ

অনুবাদ   হবে    এমন-"স্মরণ    কর, যখন    ফেরেস্তারা মারিয়ামের  কাছে   এসে   বলল- হে   মারিয়াম, আল্লাহ‌ আপনাকে  মনোনীত  করেছেন, তোমাকে পবিত্রতা দান করেছেন  এবং  সারা  বিশ্বের নারীদের মধ্যে আপনাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন"(3:42)। আরও দেখুন-

إِذْ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ يَا مَرْيَمُ إِنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكِ بِكَلِمَةٍ مِنْهُ اسْمُهُ الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ وَجِيهًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ

অনুবাদ হবে এমন-"এবং  ফেরেস্তারা  আরও  বলল- হে মারিয়াম, আল্লাহ‌    আপনাকে    নিজের    পক্ষ    থেকে কালেমার  সুখবর  দিচ্ছেন। তার  নাম  হবে- মসীহ ঈসা ইবনে মারিয়াম। সে  সম্মানিত  হবে  পৃথিবী ও পরকালে এবং   আল্লাহ‌র  নৈকট্যলাভকারী   বান্দাদের   অন্তর্ভুক্ত হবে"(3:45)। আরও দেখুন-

فَاتَّخَذَتْ مِنْ دُونِهِمْ حِجَابًا فَأَرْسَلْنَا إِلَيْهَا رُوحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا

অনুবাদ হবে এমন-"পর্দা  টেনে  তাদের  থেকে  নিজেকে আড়াল করে নিয়েছিল। এ  অবস্থায়  আমি  তার  কাছে নিজের পক্ষ থেকে  রূহকে [অর্থাৎ  জিব্রাঈল (আ)- কে] পাঠালাম এবং সে তার সামনে একটি পূর্ণ মানবিক রুপ নিয়ে উপস্থিত হল"(19:17)।

   হ‍্যাঁ সুধী পাঠক, উপরিউক্ত 3:42 ও 3:45 এবং 19:17 আয়াত  দেখলে  আপাত দৃষ্টিতে এটা মনে হবে যে, উক্ত আয়াত  সাংঘর্ষিক। কিন্তু  উক্ত  আয়াত  সাংঘর্ষিক  নয় বরং  একে-অপরের  পরিপূরক। কিন্তু  কিভাবে?? চলুন তাহলে, একটা উদাহরণ দেওয়া যাক-

মনে  করুন, আমি  বললাম- চা  তৈরী  করতে হলে চিনি প্রয়োজন। আবার   বললাম- চা   তৈরী  করতে  হলে 'চা পাতা' প্রয়োজন। এবার বলুন- এ 2 টি কথা কি পরস্পর বিরোধী  বা  সাংঘর্ষিক, না  কি 2  টিই ঠিক এবং একে- অপরের   পরিপূরক?? একে-অপরের   পরিপূরক, তাই না??

   ঠিক   একই   ভাবে   উপরিউক্ত  3:42  ও  3:45 এবং 19:17  আয়াতও   সাংঘর্ষিক  নয়  বরং  একে-অপরের পরিপূরক। কিন্তু কিভাবে?? চলুন তাহলে-

3:42  ও  3:45  আয়াতে  বলা   হয়েছে   যে- ফেরেস্তারা এসেছিল   এবং   19:17   আয়াতে   বলা   হয়েছে   যে- জিব্রাঈল (আ) এসেছিল। এই তো?? এবার  একটা প্রশ্ন করতে  চাই, তাহলেই  পরিষ্কার  হয়ে  যাবে। প্রশ্নটি  হল- আল্লাহর বাণী বা বার্তা পৌঁছনোর দায়িত্ব  কার?? উত্তর হবে- জিব্রাঈল (আ)- এর!! তাই  না?? তাহলে 3:42  ও 3:45 আয়াতে  বলা  হচ্ছে-"ফেরেস্তারা   বলল"। এখানে "ফেরেস্তারা বলবে" কেন?? বলার দায়িত্ব তো  জিব্রাঈল (আ)- এর। কিন্তু যেহেতু তখন জিব্রাঈল (আ)- এর সঙ্গে আরও  ফেরেস্তা  ছিল, তাই 3:42 ও 3:45 আয়াতে বলা হয়েছে-"ফেরেস্তারা বলল"।

   আর, যেহেতু   জিব্রাঈল  (আ)   ছিল   উক্ত   ফেরেস্তা দলের    প্রতিনিধি, সেহেতু   19:17   আয়াতে   শুধুমাত্র জিব্রাঈল  (আ)-   এর   কথা   বলা   হয়েছে। তাই, 2  টি আয়াত সাংঘর্ষিক নয় বরং 2 টি  আয়াতে  একই  ঘটনা ভিন্ন  দৃষ্টিকোণ  হতে  উপস্থাপন  করা  হয়েছে। বুঝলেন মশাই??

6) কোরান  বোঝা  সহজ, না  কি  কঠিন  তথা  দুষ্কর বা অসম্ভব?? এ বিষয়ে  কোরানে  2  স্থানে  2  রকম  কথা বলা হয়েছে। যেমন- 54:17 ও 22 ও 32 ও 40 আয়াতে বলা   হয়েছে- কোরান   বোঝা   খুব   সহজ   এবং   3:7 আয়াতে বলা  হয়েছে- কোরান  বোঝা  অসম্ভব। এখানে কোনটা ঠিক??

   সুধী পাঠক, কোনটা  ঠিক- পরে  বিচার  করতে  বসব ক্ষণ‌। প্রথমে আয়াত গুলো দেখে নিন-

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ

অনুবাদ হবে এমন-"আমি এ  কোরানকে  বোঝার  জন্য সহজ  করে  দিয়েছি। এতএব  কেউ  আছে কি উপদেশ গ্রহণের জন্য"(54:17,22,32,40)?? আরও দেখুন-

هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ ۖ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ ۗ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ ۗ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ رَبِّنَا ۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ

অনুবাদ হবে এমন-"তিনিই   তোমাদের   জন্য    এ   গ্ৰন্থ অবতীর্ণ  করেছেন। এ  গ্ৰন্থে  2  ধরনের  আয়াত আছে। এক হচ্ছে- মুহকামাত, যেগুলো   এ   গ্ৰন্থের   মূল   এবং দ্বিতীয় হচ্ছে- মুতাশাবিহাত। যাদের  মনে বক্রতা আছে, তারা  ফিতনা  সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সবসময় মুতাশাবিহাতের পিছনে  লেগে  থাকে  এবং  তার  অর্থ করার চেষ্টা করে থাকে। অথচ  সেগুলোর আসল অর্থ আল্লাহ‌ ছাড়া আর কেউ জানে না। বিপরীত  পক্ষে  যারা  পরিপক্ক  জ্ঞানের অধিকারী  তারা  বলে- আমরা  এর প্রতি ঈমান এনেছি, এ  সব  আমাদের  রবের  পক্ষ  থেকেই   এসেছে। আর, প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানবান  লোকেরাই  কোনও  বিষয়  থেকে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে"(3:7)।

   সুধী পাঠক, উপরে 3:7 আয়াত  দেখলেন  তো?? কই এই  আয়াতে  কোথায়  বলা  হয়েছে  যে, কোরান বোঝা কঠিন   বা  খুব  কঠিন?? হ‍্যাঁ, বরং   শুধুমাত্র  এটা  বলা হয়েছে  যে-"মুতাশাবিহাতের   অর্থ  আল্লাহ  ছাড়া  আর কেউ জানেন না"। এখন  প্রশ্ন  হতে  পারে- মুতাশাবিহাত কি?? যদি আপনি আরবি কোরান পড়ে থাকেন, তাহলে জানবেন যে- কিছু  সূরার  শুরুতে  কিছু  আরবি অক্ষর ব‍্যবহার  করা  হয়েছে। যেমন- الم বা الر বা  يس ইত‍্যাদি। এগুলো  বলা  হয় 'আয়াতে  মুতাশাবিহাত'। এই আয়াত গুলোর অর্থ  শুধুমাত্র  আল্লাহ জানেন এবং এই আয়াত গুলোর অর্থ আপনি না জানলেও তাতে ইসলামী জীবন যাপন করার  ক্ষেত্রে  আপনার কোনও সমস্যাই হবে না। আর, এই ধরণের  আয়াত  কোরানে  মাত্র 29 টি আছে। আর, সব কটা আয়াত মিলিয়ে দিলে 1 লাইনও হবে না। এই 29 টি مُتَشَابِهَاتٌ (মুতাশাবিহাত) আয়াত ছাড়া বাকি আয়াত গুলোকে مُحْكَمَاتٌ (মুহকামাত) বলা  হয়, যা হল কোরানের মূল এবং তা আপনার জন্য। আর, বলে রাখা দরকার যে- مُحْكَمَاتٌ (মুহকামাত) সম্পর্কেইইইই আল্লাহ কোরানে বলেছেন-

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ

অনুবাদ হবে এমন-"আমি এ  কোরানকে  বোঝার  জন্য সহজ  করে  দিয়েছি। এতএব  কেউ  আছে কি উপদেশ গ্রহণের জন্য"(54:17,22,32,40)??

   সুধী পাঠক, এখনও   কি   আপনার   মনে   হচ্ছে  যে- 54:17, 22, 32, 40  এবং 3:7 আয়াত কি সাংঘর্ষিক, না পরিপূরক??

7) জাহান্নাম বাসিদের  খাবার  কি  হবে?? পুঁজ-রক্ত, না কি  কাঁটাওয়ালা  শুকনো ঘাস?? এ বিষয়ে  কোরানে  2  স্থানে 2 রকম কথা বলা হয়েছে। যেমন- 69:36 আয়াতে বলা হয়েছে- জাহান্নাম  বাসিদের  একমাত্র  খাবার  হবে পুঁজ-রক্ত এবং  88:6  আয়াতে  বলা  হয়েছে- জাহান্নাম বাসিদের   একমাত্র   খাবার  হবে  কাঁটাওয়ালা  শুকনো ঘাস। এখানে কোনটা ঠিক??

   সুধী পাঠক, আমরা  সব সময়  যা  করি, এখনও  তাই করতে চাই। অর্থাৎ প্রথমে আয়াত গুলো দেখুন-

وَلَا طَعَامٌ إِلَّا مِنْ غِسْلِينٍ

অনুবাদ হবে এমন-"তাদের জন্য আর কোনও খাদ্য নেই ক্ষত নিঃসৃত পুঁজ-রক্ত ছাড়া(69:36)।

لَيْسَ لَهُمْ طَعَامٌ إِلَّا مِنْ ضَرِيعٍ

অনুবাদ হবে এমন-"তাদের   জন্য   আর   কোনও  খাদ্য থাকবে না  কাঁটাওয়ালা  শুকনো  ঘাস ছাড়া আর কোন খাদ্য থাকবে না"(88:6)।

   হ‍্যাঁ, আপাতদৃষ্টিতে উপরিউক্ত  2  টি আয়াত দেখলেই মনে হবে যে, এটা স্পষ্ট অসংগতি, বৈপরীত্য, সাংঘর্ষিক অথবা পরস্পর বিরোধী  কথা। তাহলে কি হবে এখন?? কিছুই হবে না, তাই চিন্তার কিছু  নেই। কেননা, কোরানে আল্লাহ এ বিষয়ে বলেছেন এভাবে-

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا

অনুবাদ হবে এমন-"তারা  কি  কোরান  সম্পর্কে   চিন্তা-ভাবনা  করে  না?? যদি এটি আল্লাহ‌ ছাড়া অপর কারো পক্ষ  থেকে হত, তাহলে  তারা  এর  মধ্যে  বহু  পরস্পর বিরোধী কথা এবং অসঙ্গতি  খুঁজে  পেত"(4:82)। আর, হোসেন তো  এখন  বেঁচে  আছে, না কি?? তাহলে  চিন্তা করছেন কেন??

   সুধী পাঠক, উপরিউক্ত 2 টি আয়াত ছাড়াও কোরানে এই ধরণের আরও আয়াত রয়েছে, দেখুন-

إِنَّ شَجَرَتَ الزَّقُّومِ(44:43) طَعَامُ الْأَثِيمِ(44:44)।

অনুবাদ হবে এমন-"নিশ্চয়  যাক্কুম  গাছ"(44:43)। এবং তা হবে পাপিদের খাদ‍্য"(44:44)। এই  যাক্কুম  গাছ   এর কথা  কোরানে  আরও  বেশ   কয়েকবার   আছে, যথা- 37:62-66  এবং  56:52-53  আয়াতে। যাইহোক, এবার আমরা মূল প্রশ্নে ফিরে  আসি!! তাহলে  পাপিদের খাদ্য কি হবে?? এ বিষয়ে কোরান 3 টি তথ্য দিয়েছে এবং তা সাংঘর্ষিক!!

   এখানে  হয়ত  কোনও  নাস্তিক  খুব  খুশি  হবেন এবং বলতে পারেন-"তাহলে 4:82 আয়াতে আল্লাহর চ‍্যালেঞ্জ মিথ্যা মিথ্যা প্রমাণিত হল  তো"?? আমি  অর্থাৎ  লেখক (হোসেন কুরানী) বলতে  চাই  যে, এত   খুশি   হবেন  না ভাই!! কারণ, এ খুশির হায়াত কম, এ খুশি এক্ষুনি মৃত্যু বরণ করবে!! কিন্তু কিভাবে?? এভাবে-

لَهَا سَبْعَةُ أَبْوَابٍ لِكُلِّ بَابٍ مِنْهُمْ جُزْءٌ مَقْسُومٌ

অনুবাদ হবে এমন-"এ জাহান্নাম  সাতটি  দরজা বিশিষ্ট। প্রত্যেকটি  দরজার  জন্য তাদের (পাপিদের) মধ্য থেকে একটি অংশ নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছে"(15:44)। সুধী পাঠক, জাহান্নামের  7 টি  স্তর  রয়েছে। পাপিদের  পাপ অনুযায়ী জাহান্নামের স্তর  নির্ধারণ  হবে। অর্থাৎ  উপরি উক্ত  3  টি আয়াত  মোটেও  সাংঘর্ষিক নয়। কেননা, তা কোনও  এক  স্তরের  জন্য  বলা  হয়  নি  বরং ভিন্ন ভিন্ন স্তরের   পাপিদের   কথা। ধরে   নিন- 1 নং  জাহান্নামের পাপিদের  জন্য  69:36  আয়াত  ও  2  নং  জাহান্নামের পাপিদের  জন্য  88:6  আয়াত এবং 3  নং  জাহান্নামের পাপিদের জন্য 44:43-44 আয়াতটি। তাই, উপরিউক্ত 3 টি আয়াত মোটেও সাংঘর্ষিক নয়!! বুঝলেন বাবু??

   সুধী পাঠক, গতকাল অর্থাৎ 21.9.19 তারিখের রাতে লেখা শেষ  করেছি। বলার মত আর সেরকম কিছু নেই। প্রতিবার  যা  বলি, আজও  তাই বলব। অর্থাৎ আপনার মায়ের জন্য দোয়া  করার  সময় আমার মায়ের জন‍্যেও জান্নাতুল   ফেরদৌস    প্রার্থনা    করবেন। আর, আরও অনুরোধ  থাকল  আপনার  প্রার্থনায়  যেন "নাহাল এবং হানীর সুন্দর জীবন কামনা" স্থান লাভ করে!!

   পাঠকদের অবগতির  জন্য জানাতে চাই যে, "কোরান ও  বিজ্ঞান"  বিষয়ক  তথ্য  জানতে  নিচের  লিঙ্কে  ক্লিক করতে পারেন---

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=905841909800807&id=544853392566329

   আশা করছি, বোঝাতে পারলাম। এবং আরও  কঠিন কঠিন  প্রশ্ন   থাকলে, পাঠান- ইনশাআল্লাহ  চেষ্টা  করব সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার।

                     © : লেখক, হোসেন কুরানী।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

আপনার কিছু বলার থাকলে হোসেন কুরানী কে বলুন:

Featured Post

আসন্ন আল-মালহামা ও মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ আসন্ন আল-মালহামা ও মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ: শায়েখ ইমরান হোসেনের বিশ্লেষণ বর্তমান ব...