ফিতরা আরবি শব্দ, যা এসেছে আরবি শব্দ ফুতুর হতে। আরবি ফুতুর শব্দের অর্থ হল- নাসতা, খাদ্য দ্রব্য বা জল-খাবার। এই ফিতরাকে 'যাকাতুল ফিতর' অথবা 'সাদকাতুল ফিতর'ও বলা বলা হয়ে থাকে। আমরা সাধারণত "ফেতেরা" বলে থাকি!! এটা হল- মূল শব্দের অপভ্রংশ।
সুধী পাঠক, জানেন কি ফিতরা দিতে হয় কেন?? মনে হয় জানেন না, তাই না?? জানবেন কিভাবে, হোসেন কুরানী এই তো প্রথম লিখছে!! আর ইতিপূর্বে কোনও আলেম তো কখনও বলে নি এবং তাদের অউকাতও নেই!! যাইহোক, আর Dialogue মেরে লাভ নেই, এবার আলোচনায় এগিয়ে যাই। দেখুন-
আপনি গোটা একমাস রোজা রাখলেন। এই 29/ 30 দিনে সব মিলিয়ে এক বেলা করে 29/ 30 বেলা'র খাবার বাঁচিয়েছেন। মোটা-মুটি ভাবে এই 29/ 30 বেলার বাঁচান খাবার একজন গরীব'কে দেবেন। যাতে করে ঈদের দিন তাকে কাজে বের হতে না হয় এবং সেই গরীব'ও ঈদের খুশিতে সকল মুসলিমের সাথে শরীক হতে পারে!! একজন গরীব এটা না ভাবে- সবাই ঈদে খুশি হয়ে ভাল-মন্দ খাচ্ছে অথচ আমার এবং আমার পরিবারের "খাবার" নেই। এক কথায়, রমজান মাসে রোজদারের বেঁচে যাওয়া খাবার'ই হল- ফিতরা!!
সুধী পাঠক, উপরিউক্ত তথ্যটা প্রথম জানলেন তো?? বদলে কি পারবেন না, আমার মায়ের জন্য জান্নাতুল ফেরদৌসের দোয়া করতে?? যাইহোক, এবার আমরা দেখে নেব ফিতরা কারা-কারা দেবে এবং কারা-কারা নেবে?? দেখুন-
"ইবনে উমর (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, নবী (স) বলেছেন-"প্রত্যেক ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন মুসলিমর উপর ফিতরা ধার্য্য করেছেন"(বুখারী, কিতাবুয যাকাত, হাদীস 1414)। তারমানে, গরীব বাদে প্রায় সবার উপর ফিতরা হল- "ওয়াজিব"। যারা দেবে, তারা বাদ দিয়ে সবাই নিতে পারবে!!
সুধী পাঠক, আমরা জেনে নিয়েছি ফিতরা কারা দেবে এবং কারা দেবে!! এখন জেনে নেব ফিতরা'র পরিমাণ কত ও কি কি?? চলুন দেখি-
"সাহাবা আবু সাঈদ (রা) হতে বর্ণিত। আমরা [নবী (স)- এর যুগে] সাদকাতুল ফিতর বাবদ [মাথা পিছু] এক "সা" খাবার আটা আথবা এক "সা" যব অথবা এক "সা" খেঁজুর অথবা এক "সা" পনির অথবা এক "সা" কিসমিস প্রদান করতাম"(বুখারী, হাদীস নং 1418)।
সুধী পাঠক, "সা" বলতে কি বুঝতে পারছেন?? মনে হয় বুঝতে পারছেন না, তাই না?? এটা তৎকালীন একটি মাপন পদ্ধতি। আরবির 4 "মুদ" এ 1 "সা" হয়। এক মুদের পাত্রে প্রায় 750 ml পানি ধরত। এবার চার মুদে এক "সা"। তার মানে 750ml × 4 = 3000ml. এবার আপনি বলুন, 3000ml বা 3 লিটারের পানির পাত্রে কতটা আটা, যব, খেঁজুর, কিসমিস বা পনির ধরতে পারে?? ব্যাস, ততটাই হবে এক জনের- ফিতরা। ধরে নেওয়া যেতে পারে- 3 লিটারের পাত্রে 3 কেজি খাদ্য দ্রব্য ধরত!!
সুধী পাঠক, নবী (স) ওজু ও গোসলে কত পানি খরচ করতেন এবং মুদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে নিচের Link এ Click করুন---
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=599280567123611&id=544853392566329
সুধী পাঠক, এবার আমরা "গম" প্রসঙ্গে আলোচনা করতে চাইছি। কারণ আমাদের সমাজে ফিতরা হিসাবে 2 মুদ বা 1.50 কেজি/ 1.75 কেজি "গম" অথবা "আটা" এর হিসাব করে টাকা দেওয়ার রীতি আছে। এখন প্রশ্ন হল- 2 মুদ বা 1.50 কেজি/ 1.75 কেজি "গম" অথবা "আটা" এর হিসাব করে টাকা দেওয়া যাবে??
কি হতে পারে, এ প্রশ্নের উত্তর?? পাঠক, আপনি কি কিছু আন্দাজ করতে পারছেন?? যাক, গমের ইতিহাস একটু বলি!! ঐতিহাসিক গোলাম আহমদ মর্তজার ছাত্র তো, তাই ইতিহাসে একটু-আধটু দখল আছে, এই আর কি!!
গমের প্রচলন নবী (স)- এর যুগে হয়নি, ইসলামের ইতিহাসে রাজতন্ত্রের জন্মদাতা মোয়াবিয়া (রা)- এর সময়ে অর্ধ "সা" বা 2 মুদ গমের প্রচলন হয়েছিল। বলে রাখা দরকার যে, মোয়াবিয়া (রা)- এর দ্বারা গমের প্রচলনের যথেষ্ট কারণও বিদ্যমান ছিল। প্রশ্ন হবে- কি হয়ে ছিল, যার জন্য গমের প্রচলন করতে হল?? উত্তর সহজ- বড় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। ফলে প্রচলিত নবী (স)- এর পদ্ধতিতে অনেকেই ফিতরা দিতে অসামর্থ্য হত। এদিকে লক্ষ্য রেখে মোয়াবিয়া (রা) সিরিয়া থেকে গম আনালেন এবং ফতোয়া জারি করলেন যে, এই বছরে 4 মুদ বা 1 সা এর বদলে 2 মুদ বা অর্ধ সা ফিতরা দিলেই হবে এবং গমের দাম অন্যান্য খাদ্য দ্রব্যের তুলনায় কম হওয়াতে ফিতরা হিসাবে গম দিলেই হবে!!
সুধী পাঠক, এখন আপনি কি করবেন?? নবী (স)- এর অনুসরণ করবেন, না কি মোয়াবিয়া (রা)- এর অনুসরণ করবেন?? বিষয়টি কোরানে আল্লাহ বলেছেন এভাবে- أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ সঠিক অনুবাদ হবে এমন-"আল্লাহ ও তার রাসুলের অনুসরণ কর"(3:31, 3:32, 3:132, 4:59, 5:92, 8:1, 8:20, 8:46, 19:54, 19:56, 33:33, 33:71, 36:20, 47:33, 58:13, 64:12)। এক কথায়, এই আয়াতটি কোরানে কমপক্ষে 16 বার এসেছে। এখন আপনি নিজেই ঠিক করুন, কাকে অনুসরণ করবেন??
এছাড়াও ইসলাম পরিপূর্ণ হয়েছে নবী মহাম্মদ (স)- এর যুগেই। এ বিষয়ে কোরানে আল্লাহ বিষয়টি তুলে ধরেছেন এভাবে- الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ অনুবাদ হবে এমন-"আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করলাম"(5:3)। এখন প্রশ্ন হল- ইসলাম যদি নবী (স)- এর যুগে পূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে মোয়াবিয়া (রা)- এর নির্দেশ আমি কেন মানব?? আপনি কেন মানেন?? আপনি কি মনে করেন- ইসলাম অসম্পূর্ণ??
সুধী পাঠক, ফিতরা কখন দিতে হয় জানেন কি?? আমাদের সমাজে ঈদের নামাজ আদায় করে ফিরে আসার পর ফিতরা দেওয়ার প্রচলন আছে কিন্তু এই পদ্ধতি সঠিক কি?? এ বিষয়ে হাদীস কি বলে?? চলুন তাহলে দেখি-
"ইবনে উমার (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন- ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য বের হওয়ার পূর্বে সাদকাতুল ফিতর প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। নাফি (র) বলেন- ইবনে উমার (রা) ঈদের এক বা দু দিন পূর্বেই ফিতরা আদায় করতেন"(আবু দাউদ, কিতাবুয যাকাত, হাদীস 1610)। আরও একটি হাদীস দেখুন-
"সাহাবা ইবনে আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত। ঈদের নামাজ আদায় করার আগে ফিতরা আদায় করতে হবে, নাহলে তা "ফিতরা" না হয়ে সাধারণ দান বলে গণ্য হবে"(আবু দাউদ, কিতাবুয যাকাত, হাদীস 1609)।
সুধী পাঠক, খাদ্য দ্রব্য হিসাবে ফিতরা না দিয়ে কি আমরা তার বদলে টাকা দিতে পারি?? এ প্রশ্নের উত্তর হল- নবী (স) খাদ্য দ্রব্যের মাধ্যমে ফিতরা আদায় করতে বলেছেন, তাই তা দিয়েই করতে হবে। তার বদলে টাকা দিয়ে আদায় করা বিদআত। প্রশ্ন হবে- তাহলে যাকাতের বেলায় তো কই দীনার বা দীরহামে যাকাত দিচ্ছি না??
এ প্রশ্নের সহজ। দীনার ও দীরহাম ব্যবস্থা নেই, যদি থাকত, তাহলে দীনার ও দীরহামের মাধ্যমেই যাকাত আদায় করতে হত কিন্তু যা যা দিয়ে ফিতরা আদায় করতে হয়, তা পাওয়া সহজলভ্য!! তাই আপনাকে খাদ্য দ্রব্য দিয়েই ফিতরা আদায় করতে হবে।
সুধী পাঠক, আপনি কি যাকাত সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ইচ্ছুক?? তাহলে পশুদের যাকাত, ফসলের যাকাত ও অর্থের যাকাত সম্পর্কে জানতে নিচের Link এ Click করুন---
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=607197069665294&id=544853392566329
সুধী পাঠক, ফিতরা কেন দিতে হবে, তা জেনে নিয়েছি কিন্তু রোজা কেন রাখব এবং তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানা নেই, তাই না?? জানতে চাইবেন না, রোজা রাখতে হয় কেন?? নিচে Link দিচ্ছি, Link এ Click করুন--- https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=594983710886630&id=544853392566329
সুধী পাঠক, আপনি কি ইসলামকে বিজ্ঞানের সাহায্যে জানতে ও বুঝতে চান?? তাহলে আপনার জন্য অবাক করা অনেক কিছু আছে নিচের Link এ---
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=1046074349110895&id=544853392566329
প্রথম সংস্করণ : 21.04.2020
আশা করছি, বোঝাতে পারলাম এবং আরও কঠিন কঠিন প্রশ্ন থাকলে, পাঠান- ইনশাআল্লাহ, চেষ্টা করব সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার।
© : লেখক, হোসেন কুরানী।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার কিছু বলার থাকলে হোসেন কুরানী কে বলুন: